০১:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ডিভোর্স হওয়া নারীর ‘অপহরণ’ চিৎকার—গুজবে শ্রীমঙ্গলে মবের গণপিটুনির শিকার অসুস্থ সন্তানের বাবা, স্বজন ও চালক, গাড়ি ভাঙচুর

Reporter Name
  • Update Time : ০৫:২৮:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
  • / ৭ Time View

ডিভোর্স হওয়া নারীর ‘অপহরণ’ চিৎকার—গুজবে শ্রীমঙ্গলে মবের গণপিটুনির শিকার অসুস্থ সন্তানের বাবা, স্বজন ও চালক, গাড়ি ভাঙচুর

নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ জালাল উদ্দিন। একজন বাবা তার অসুস্থ সন্তানের ছোট্ট একটি ইচ্ছা পূরণ করতে চেয়েছিলেন—গাড়িতে করে একটু ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই ‘শিশু অপহরণকারী’ সন্দেহে উত্তেজিত জনতার হাতে মারধরের শিকার হন তিনি ও তার স্বজনরা। গুজব ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করা হয় এবং গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের গণপিটুনি দেওয়া হয়। গত বুধবার (৪ মার্চ ২০২৬) দিবাগত রাত সোয়া ১১টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের স্টেশন রোড ও চৌমুহনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলা-র বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী মো. মিজান (৩৫) কয়েকদিনের ছুটিতে দেশে এসে তার ছয় বছর বয়সী থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে শ্রীমঙ্গলে যান।
মিজানের সঙ্গে তার স্ত্রী মেহেরিন জাহান শ্রাবন্তির (২৪) কিছুদিন আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তবে সন্তানের কারণে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। বর্তমানে শ্রাবন্তি শ্রীমঙ্গলে তার এক প্রবাসী ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করছেন। তার বাবার বাড়ি একই জেলার নবীনগর উপজেলা-এ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানের প্রতি মিজানের গভীর টান রয়েছে। এর আগেও তিনি শ্রীমঙ্গলে এসে সন্তানের খোঁজখবর নেন এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে যান। গত সপ্তাহেও তিনি এসে শিশুটিকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন।
বুধবার রাতে মিজান তার ভাগ্নে সোহেলকে সঙ্গে নিয়ে একটি প্রাইভেটকারে শ্রীমঙ্গলে আসেন। তিনি আগে থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সন্তানকে নিয়ে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবারের আয়োজন করেন।
খাবার শেষে তিনি শিশুটির জন্য ঈদের পোশাক ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কেনেন। এ সময় অসুস্থ শিশুটি বাবার সঙ্গে গাড়িতে করে কিছুক্ষণ ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
স্থানীয়রা জানান, সন্তানের সেই আবদার পূরণ করতে মিজান তাকে নিয়ে প্রাইভেটকারে ওঠেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মোড় নিতে শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে ওঠার পরপরই শিশুটির মা শ্রাবন্তি চিৎকার করে অভিযোগ করেন যে তার সন্তানকে ছিনতাইকারীরা অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে।
এই চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত জড়ো হয়ে যায় এবং গাড়িটির পিছু নেয়। নিরাপত্তার আশঙ্কায় গাড়ি থেকে না নেমে চালক দ্রুত গাড়িটি শহরের চৌমুহনা এলাকার দিকে নিয়ে যান।
কিন্তু এরই মধ্যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে—একটি সাদা প্রাইভেটকারে করে একটি শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল উত্তেজিত যুবক গাড়িটি আটকে ফেলে। এরপর শুরু হয় ভাঙচুর ও মারধর।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাড়ির কাঁচ ভাঙা হয় এবং গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের বের করে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে মিজান তার সন্তানকে নিয়ে সেখান থেকে সরে যেতে সক্ষম হলেও গাড়িতে থাকা তার ভাগ্নে সোহেল ও চালক পালাতে পারেননি। উত্তেজিত জনতা তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে গণপিটুনি দেয় এবং গাড়িটি ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
অনেকে ঘটনাটিকে ‘গুজবের ভয়াবহতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত দুজনকে উদ্ধার করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রাইভেটকারটি থানায় নিয়ে যায়। পরে সন্তানের মা ও বাবাকেও থানায় আনা হয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ঘটনাটি অপহরণ বা ছিনতাইয়ের নয়; বরং পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি ও গুজবের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ডিভোর্স হওয়ার পরও তারা সন্তানের কারণে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছিলেন। এরপর ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
তিনি বলেন, “উভয় পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে প্রায়ই এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। কোনো ঘটনা যাচাই না করেই জনতার উত্তেজিত হয়ে পড়া পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ডিভোর্স হওয়া নারীর ‘অপহরণ’ চিৎকার—গুজবে শ্রীমঙ্গলে মবের গণপিটুনির শিকার অসুস্থ সন্তানের বাবা, স্বজন ও চালক, গাড়ি ভাঙচুর

Update Time : ০৫:২৮:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

ডিভোর্স হওয়া নারীর ‘অপহরণ’ চিৎকার—গুজবে শ্রীমঙ্গলে মবের গণপিটুনির শিকার অসুস্থ সন্তানের বাবা, স্বজন ও চালক, গাড়ি ভাঙচুর

নিজস্ব প্রতিবেদক: মোঃ জালাল উদ্দিন। একজন বাবা তার অসুস্থ সন্তানের ছোট্ট একটি ইচ্ছা পূরণ করতে চেয়েছিলেন—গাড়িতে করে একটু ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই ‘শিশু অপহরণকারী’ সন্দেহে উত্তেজিত জনতার হাতে মারধরের শিকার হন তিনি ও তার স্বজনরা। গুজব ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করা হয় এবং গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের গণপিটুনি দেওয়া হয়। গত বুধবার (৪ মার্চ ২০২৬) দিবাগত রাত সোয়া ১১টার দিকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরের স্টেশন রোড ও চৌমুহনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ঘিরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলা-র বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী মো. মিজান (৩৫) কয়েকদিনের ছুটিতে দেশে এসে তার ছয় বছর বয়সী থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে শ্রীমঙ্গলে যান।
মিজানের সঙ্গে তার স্ত্রী মেহেরিন জাহান শ্রাবন্তির (২৪) কিছুদিন আগে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তবে সন্তানের কারণে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। বর্তমানে শ্রাবন্তি শ্রীমঙ্গলে তার এক প্রবাসী ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করছেন। তার বাবার বাড়ি একই জেলার নবীনগর উপজেলা-এ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সন্তানের প্রতি মিজানের গভীর টান রয়েছে। এর আগেও তিনি শ্রীমঙ্গলে এসে সন্তানের খোঁজখবর নেন এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে যান। গত সপ্তাহেও তিনি এসে শিশুটিকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন।
বুধবার রাতে মিজান তার ভাগ্নে সোহেলকে সঙ্গে নিয়ে একটি প্রাইভেটকারে শ্রীমঙ্গলে আসেন। তিনি আগে থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সন্তানকে নিয়ে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবারের আয়োজন করেন।
খাবার শেষে তিনি শিশুটির জন্য ঈদের পোশাক ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কেনেন। এ সময় অসুস্থ শিশুটি বাবার সঙ্গে গাড়িতে করে কিছুক্ষণ ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
স্থানীয়রা জানান, সন্তানের সেই আবদার পূরণ করতে মিজান তাকে নিয়ে প্রাইভেটকারে ওঠেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মোড় নিতে শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে ওঠার পরপরই শিশুটির মা শ্রাবন্তি চিৎকার করে অভিযোগ করেন যে তার সন্তানকে ছিনতাইকারীরা অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে।
এই চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত জড়ো হয়ে যায় এবং গাড়িটির পিছু নেয়। নিরাপত্তার আশঙ্কায় গাড়ি থেকে না নেমে চালক দ্রুত গাড়িটি শহরের চৌমুহনা এলাকার দিকে নিয়ে যান।
কিন্তু এরই মধ্যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে—একটি সাদা প্রাইভেটকারে করে একটি শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল উত্তেজিত যুবক গাড়িটি আটকে ফেলে। এরপর শুরু হয় ভাঙচুর ও মারধর।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাড়ির কাঁচ ভাঙা হয় এবং গাড়িতে থাকা ব্যক্তিদের বের করে বেধড়ক মারধর করা হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে মিজান তার সন্তানকে নিয়ে সেখান থেকে সরে যেতে সক্ষম হলেও গাড়িতে থাকা তার ভাগ্নে সোহেল ও চালক পালাতে পারেননি। উত্তেজিত জনতা তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে গণপিটুনি দেয় এবং গাড়িটি ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওগুলো ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
অনেকে ঘটনাটিকে ‘গুজবের ভয়াবহতা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত দুজনকে উদ্ধার করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রাইভেটকারটি থানায় নিয়ে যায়। পরে সন্তানের মা ও বাবাকেও থানায় আনা হয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ঘটনাটি অপহরণ বা ছিনতাইয়ের নয়; বরং পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝি ও গুজবের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
শ্রীমঙ্গল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জহিরুল ইসলাম মুন্না বলেন, ডিভোর্স হওয়ার পরও তারা সন্তানের কারণে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছিলেন। এরপর ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে।
তিনি বলেন, “উভয় পক্ষ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে প্রায়ই এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। কোনো ঘটনা যাচাই না করেই জনতার উত্তেজিত হয়ে পড়া পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।