কাপাসিয়ার ঘোরশ্বাব জলমহাল লীজের নামে সমঝোতা নয় সকলের জন্য উন্মুক্ত করার দাবী
- Update Time : ১১:১৫:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
- / ৮ Time View

কাপাসিয়ার ঘোরশ্বাব জলমহাল লীজের নামে সমঝোতা নয় সকলের জন্য উন্মুক্ত করার দাবী
মোঃ আলমগীর মোল্লা
গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার সনমানিয়া ও ঘাগটিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত ঘোরশ্বাব জলমহাল একটি বহুল আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উন্মুক্ত জলাশয়। স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে ঘোরশ্বাব নদী হিসেবেও ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এটি প্রায় ১২১ একর (৪৯ হেক্টর) আয়তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য ভাণ্ডার। এই জলমহালটি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার প্রধান উৎস ও অবলম্বন। এলাকায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমিষের চাহিদা পূরণে এ জলমহাল দীর্ঘদিন যাবত প্রধান উৎস হিসেবেই ভূমিকা রেখে আসছে।
জানাযায়, একসময় পাশ্ববর্তী শীতলক্ষ্যা, ব্রম্মপুত্রে ও বানার নদীর সাথে ঘোরশ্বাব জলমহাল বা জলাশয়ের যোগসূত্র ছিলো। ঘোরশ্বাব জলমহালের মাছ খুবই সুস্বাদু বলে খ্যাতি রয়েছে। ঘাগটিয়া ও সনমানিয়া ইউনিয়নের ৫/৬ টি গ্রামের প্রায় ২০ /২৫ হাজার দরিদ্র মানুষের পেশা ও জীবিকা এই জলমহালের ওপর নির্ভরশীল। জলমহালকে কেন্দ্র করে কৃষকের জীবন ব্যবস্থা গড়ে উঠার ইতিহাস অনেক পুরনো। অনেক দিন থেকে জলমহালটি ইজারা দেওয়া এবং এর বিপরীতে স্থানীয় জেলেদের উন্মুক্ত রাখার দাবি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে।
এলাকাবাসী জলমহাল লীজ দেয়া বন্ধ ও উন্মুক্ত করার দাবীতে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে বহুবার। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, এই জলমহালটি একটি উন্মুক্ত জলাশয়, যা প্রকৃত জেলেদের জন্য উন্মুক্ত থাকা প্রয়োজন। শতশত বছর এই জলমহালটি জনসাধারণের জন্য অবারিত ছিলো। কিন্তু একসময় প্রভাবশালী মহলের অর্থ লাভের নজরে পরে এটি ইজারার জালে আবদ্ধ হয়ে উন্মুক্ততা হারায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনধারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
জানাযায়, ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের গেজেট অনুযায়ী ২০ একরের অধিক সম্পত্তির জলমহালকে উন্মুক্ত জলমহাল ঘোষণা করা হয়। এ হিসাবে ঘোরশ্বাব জলমহালও উন্মুক্ত জলমহাল হিসাবে গেজেটভুক্ত হয়। এই জলমহালে একসময় সরকারী ভাবে নিয়মিত মাছের পোনা ছাড়া হতো। এর সুফল স্থানীয় জেলে সহ সাধারণ মানুষ ভোগ করতেন।
জানাযায় পরবর্তীতে গাজীপুর জেলা প্রশাসন ওই জলমহালকে ৫০ একর সম্পত্তি হিসাবে উল্লেখ করে লিজের জন্য টেন্ডার ঘোষণা করে ২০০৫ সালে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ১২,২৮,৯৬০ (বার লাখ আটাশ হাজার নয় শত ষাট) টাকায় ৩ বছরের জন্য নবযুগ মৎস চাষ উন্নয়ন ও আহরণ সমবায় সমিতি লিঃ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেয়। সেই থেকে শুরু হয় জলমহালের লীজের জীবন। বন্ধ হয় উন্মুক্ত জলাশয়।
ওই লিজের ফলে কয়েক হাজার জেলের জীবনে নেমে আসে মারাত্বক দুর্বিষহ জীবন। ১২১ একর সম্পত্তির মধ্যে ৫০ একর কীভাবে লীজ দেওয়া হলো, কিংবা ওই ৫০ একরের তফসীল ও চৌহদ্দি নির্ধারণ না করেই লীজ দেওয়া হয়েছিল এ নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠেছিলো সচেতন মহল থেকে। কিন্তু অবশিষ্ট ৫১ একর সম্পত্তি লীজ দেওয়ার পরও স্থানীয় জেলেরা ব্যবহার করতে পারার কথা থাকলেও কোন জেলে জলমহালে নামলেই তাদের ওপর নেমে আসতো পৈচাশিক নির্যাতন।
ওই লিজ বাতিলের জন্য স্থানীয় জেলে হরিপদ বর্মণ ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আপীল দায়ের করলে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার আপীল মঞ্জুর করেননি কিন্তু লিজ দেওয়া আইনগত ভাবে সঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করে ভবিষতে আর কোন লিজ না দেওয়ার পক্ষে মত দেন। হরিপদ বর্মণ ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের রায়ের বিরুদ্ধে ভূমি সচিবের নেতৃত্বে আপীল বোর্ড অব রেভিনিউ কার্যালয়ে আপীল করেন। ওখানেও একই মত প্রকাশ করে রায় দেন।
ওই বিষয়ে ২০০৬ সালে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় সরেজমিনে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো। হরিপদ বর্মণ কাপাসিয়া থানায় জেলেদের বঞ্চিত করে জলমহাল থেকে ৫ কোটি টাকা মূল্যের মাছ ও ১১লাখ টাকার মূল্যের জেলেদের ৩০টি নৌকা, দেড় লাখ টাকা মূল্যের মাছ ধরার জাল, ৪০ লাখ টাকা মূল্যের ১১০টি মাছের অভয়াশ্রমের ঝাটি চুরিসহ প্রতারণা করে উন্মুক্ত জলাশয় লিজ নেওয়া, ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছিলো। প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণের অভাবে এ মামলা পরবর্তীতে খারিজ হয়ে যায় বলে জানাযায়।
তখন অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন কাদের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসন ওই জলমহাল ইজারা দিয়েছিল তা খতিয়ে দেখা দরকার। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের আমলে গাজীপুরের মাধব বাড়ি মৎস্য খামার সহ নানা নামে জলমহাল লীজ নেয়া হলেও প্রকৃত পক্ষে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের তত্বাবধানে সমঝোতার ভিত্তিতে ঘোরশ্বাব জলমহালে মাছের চাষ হয়। ২০২৪ সালে পটপরিবর্তনের পর লীজের নামে সমঝোতার হাত বদল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘোরশ্বাব জলমহালের বুকে বাঁশ দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করায় জলাশয়ের স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এতে কচুরিপানা আটকে কৃষি ও কৃষকের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। কচুরিপানা পরিষ্কার করতে গিয়ে মৃত্যু ঘটনা ও ঘটেছে।
কাপাসিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত এ ঐতিহাসিক ঘোরশ্বাব নদী (জলমহাল) তথাকথিত ইজারা পদ্ধতি বাতিল করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবীতে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। ঘোরশ্বাব নদী অবৈধভাবে বাঁধ দিয়ে দখল করে রাখার প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে কয়েকটি গ্রামের সাধারণ মানুষ অংশ গ্রহণ করে।
গত শুক্রবার (৬ মার্চ) সকাল ১০টায় চরনিলক্ষী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয় সচেতন যুবসমাজ । সমাবেশে স্থানীয় লোকজন ।



















