০১:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কুমিল্লায় আলুর বাম্পার ফলন দাম নিয়ে শঙ্কা কৃষকরা, সরকার আলু সংগ্রহ করলে কৃষকরা বেঁচে যাবে

Reporter Name
  • Update Time : ০৮:০৭:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
  • / ৪ Time View

কুমিল্লায় আলুর বাম্পার ফলন দাম নিয়ে শঙ্কা কৃষকরা, সরকার আলু সংগ্রহ করলে কৃষকরা বেঁচে যাবে।

নেকবর হোসেন
কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম আলুর চাষ হলে বিগত বছরের মতো বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন বেশি হলে যেখানে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটার কথা, সেখানে দুশ্চিন্তার ভাজ কপালে।
কৃষকরা বলছে, ফলন ভালো হলে সংরক্ষণের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না। সরকার চাইলে কৃষকের উৎপাদিত আলু কিনে সংরক্ষণ করে পরে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে। এতে কৃষকরা যেমন দাম পাবে, তেমনি সংটকালে টিসিবির মাধ্যমে কম দামে আলু পেতে পারে সাধারণ মানুষ। না হয় বিগত বছরগুলোর মতো আবারো লোকসানের মুখ দেখবে চাষীরা, মাঠে- উঠোনে পচবে আলু।

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বছর আলু চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫ শত হেক্টর। আলু চাষ হয়েছে ৮ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে। ফলন বাম্পার হয়েছে। কয়েক জাতের আলু উৎপাদন সন্তোষজনক। কৃষকদের যে দাবি সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ- বিষয়টি উপকারী। সরকারি উদ্যোগে আলু সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না – এ বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব।’
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, কুমিল্লার প্রায় সকল উপজেলাতে আলুর ভালো ফলন হয়েছে। লালমাই উপজেলার বরল এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই মাঠ থেকে আলু উত্তোলন করছেন কৃষকরা।

কৃষক রুস্তম আলী বলেন, ‘গতবার অনেক কম দামে আলু বিক্রি করলেও এবার আবারও আলু চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। এলাকার সব কৃষকই খুশি। কিন্তু সমস্যা হলো শুরুর দিকে বেপারীদের আলুর চাহিদা থাকে দাম বেশি পাওয়া যায়, যাদের আলু তুলতে দেরী হয় তারাই মন মত দাম পায় না। তাই কৃষকরা এখন চায় ন্যায্য দামে আলু বিক্রির নিশ্চয়তা, সরকার চাইলে কৃষক বাঁচাতে পারে।’

আড়তদার নাসির উদ্দিন বলেন, ‘৪২ কেজির বস্তা ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাহলে কেজি হয় ১২ টাকা। আর কৃষকের কাছ থেকে কেনা হয় কেজি পরে ৯/১০ টাকা। এখনো গত বছরের আলু বের হচ্ছে কোল্ডস্টোরেজ হচ্ছে।’

আলু চাষী সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘সরকার যদি নির্ধারিত মূল্যে আলু কিনে রাখে তাহলে আড়তদারের কাছে আলু বিক্রির পরও যদি আলু থাকে তাহলে সেটি নষ্ট হবে না। আমি গত বছর তিনভাগের দুই ভাগ আলু বিক্রি করেছি লাভে, বাকি এক ভাগ লোকসানে। বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করেছি। কিন্তু খুচরা বাজার থেকে আমাকেই ২৮/৩০ টাকা কেজি আলু কিনে খেয়েছি।’

সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘সরকার আলু সংগ্রহ করলে প্রান্তিক চাষী ও উদ্যোক্তা চাষী বেঁচে যাবে। মজুতদার থেকে মানুষও বাঁচবে।’

বগুড়া থেকে আসা নিমসার বাজারের আলুর আড়তদার মো. আইয়ুব বলেন, ‘শুরুতে ব্যাপারীরা মোটমুটি দামে আলু কিনে মজুদ করে ফেলে। এরপর যখন বাজারে আলুর দাম কমে যায় তখন তারা বেচা বন্ধ করে দেয়। কৃষক তখন আলু পঁচে যাওয়ার ভয়ে কম দামে বিক্রি করতে থাকে। আবার যখন সঙ্কট দেখা দেয় তখন মজুতদাররা আবার বাজারে আলু বেশি দামে ছাড়তে শুরু করে।’

বিগত বছর দেখা গিয়েছিল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি তাদের উৎপাদিত আলু নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে। দাম কম পাওয়ার পাশাপাশি জায়গা না পাওয়াই অনেককেই দেখা গেছে মাঠে ঘাটে আলু ফেলে রাখতে। কারও কারও আলু পচে গিয়েছে, কেউ আবার একেবারে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে বাজারে।

সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়েছে নতুন উদ্যোক্তা চাষিরা। তারপরও এ বছর কৃষকরা আবারও আলু উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে এবং বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসা. আফরিনা আক্তার।

কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘বুড়িচং উপজেলায় রপ্তানিযোগ্য ভ্যালেন্সিয়া এবং বাড়ি ৯০ জাতের আলোর ভালো ফলন হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কৃষকরা কার্ডিনাল, ডায়মন্ড ও সানশাইন যাতে দেশীয় আলু চাষ করে লক্ষমাত্রা অর্জন করেছে। কিন্তু দাম এবারও কম। সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মণ ধরে আলু বিক্রি হচ্ছে। এই দামে বিক্রি হলে লোকসানই হবে।’

কুমিল্লার কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আলু একসময় ওএমএসে বিক্রি হয়েছে। আলুর দাম পেতে হলে আলু দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানিযোগ্য আলু চাষে আগ্রহী হতে হবে কৃষকদের এবং সরকার উদ্যোগ নিলে আলু রপ্তানিও সম্ভব।’

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আলু চাষে কুমিল্লা কৃষকরা আগ্রহী। উৎপাদনও ভালো। কিন্তু মৌসুমে আলু বিক্রি নিয়ে কৃষকরা যে সমস্যায় পরে তা নিয়ে তাদের দাবি সরকারকে জানাতে পারব।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, ‘কৃষিমন্ত্রী মহোদয় কুমিল্লার সন্তান। তিনি কুমিল্লার পাশাপাশি সারাদেশের কৃষকদের কথাই ভাববেন। সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ করে কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করা যায় কি না- আমরা বিষয়টি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে জানাব।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

কুমিল্লায় আলুর বাম্পার ফলন দাম নিয়ে শঙ্কা কৃষকরা, সরকার আলু সংগ্রহ করলে কৃষকরা বেঁচে যাবে

Update Time : ০৮:০৭:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

কুমিল্লায় আলুর বাম্পার ফলন দাম নিয়ে শঙ্কা কৃষকরা, সরকার আলু সংগ্রহ করলে কৃষকরা বেঁচে যাবে।

নেকবর হোসেন
কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম আলুর চাষ হলে বিগত বছরের মতো বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন বেশি হলে যেখানে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটার কথা, সেখানে দুশ্চিন্তার ভাজ কপালে।
কৃষকরা বলছে, ফলন ভালো হলে সংরক্ষণের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না। সরকার চাইলে কৃষকের উৎপাদিত আলু কিনে সংরক্ষণ করে পরে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারে। এতে কৃষকরা যেমন দাম পাবে, তেমনি সংটকালে টিসিবির মাধ্যমে কম দামে আলু পেতে পারে সাধারণ মানুষ। না হয় বিগত বছরগুলোর মতো আবারো লোকসানের মুখ দেখবে চাষীরা, মাঠে- উঠোনে পচবে আলু।

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ বছর আলু চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ৫ শত হেক্টর। আলু চাষ হয়েছে ৮ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে। ফলন বাম্পার হয়েছে। কয়েক জাতের আলু উৎপাদন সন্তোষজনক। কৃষকদের যে দাবি সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ- বিষয়টি উপকারী। সরকারি উদ্যোগে আলু সংগ্রহ করার উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না – এ বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করব।’
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, কুমিল্লার প্রায় সকল উপজেলাতে আলুর ভালো ফলন হয়েছে। লালমাই উপজেলার বরল এলাকার মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই মাঠ থেকে আলু উত্তোলন করছেন কৃষকরা।

কৃষক রুস্তম আলী বলেন, ‘গতবার অনেক কম দামে আলু বিক্রি করলেও এবার আবারও আলু চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। এলাকার সব কৃষকই খুশি। কিন্তু সমস্যা হলো শুরুর দিকে বেপারীদের আলুর চাহিদা থাকে দাম বেশি পাওয়া যায়, যাদের আলু তুলতে দেরী হয় তারাই মন মত দাম পায় না। তাই কৃষকরা এখন চায় ন্যায্য দামে আলু বিক্রির নিশ্চয়তা, সরকার চাইলে কৃষক বাঁচাতে পারে।’

আড়তদার নাসির উদ্দিন বলেন, ‘৪২ কেজির বস্তা ৪৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাহলে কেজি হয় ১২ টাকা। আর কৃষকের কাছ থেকে কেনা হয় কেজি পরে ৯/১০ টাকা। এখনো গত বছরের আলু বের হচ্ছে কোল্ডস্টোরেজ হচ্ছে।’

আলু চাষী সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘সরকার যদি নির্ধারিত মূল্যে আলু কিনে রাখে তাহলে আড়তদারের কাছে আলু বিক্রির পরও যদি আলু থাকে তাহলে সেটি নষ্ট হবে না। আমি গত বছর তিনভাগের দুই ভাগ আলু বিক্রি করেছি লাভে, বাকি এক ভাগ লোকসানে। বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করেছি। কিন্তু খুচরা বাজার থেকে আমাকেই ২৮/৩০ টাকা কেজি আলু কিনে খেয়েছি।’

সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘সরকার আলু সংগ্রহ করলে প্রান্তিক চাষী ও উদ্যোক্তা চাষী বেঁচে যাবে। মজুতদার থেকে মানুষও বাঁচবে।’

বগুড়া থেকে আসা নিমসার বাজারের আলুর আড়তদার মো. আইয়ুব বলেন, ‘শুরুতে ব্যাপারীরা মোটমুটি দামে আলু কিনে মজুদ করে ফেলে। এরপর যখন বাজারে আলুর দাম কমে যায় তখন তারা বেচা বন্ধ করে দেয়। কৃষক তখন আলু পঁচে যাওয়ার ভয়ে কম দামে বিক্রি করতে থাকে। আবার যখন সঙ্কট দেখা দেয় তখন মজুতদাররা আবার বাজারে আলু বেশি দামে ছাড়তে শুরু করে।’

বিগত বছর দেখা গিয়েছিল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি তাদের উৎপাদিত আলু নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে। দাম কম পাওয়ার পাশাপাশি জায়গা না পাওয়াই অনেককেই দেখা গেছে মাঠে ঘাটে আলু ফেলে রাখতে। কারও কারও আলু পচে গিয়েছে, কেউ আবার একেবারে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে বাজারে।

সবচেয়ে বেশি লোকসানে পড়েছে নতুন উদ্যোক্তা চাষিরা। তারপরও এ বছর কৃষকরা আবারও আলু উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে এবং বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসা. আফরিনা আক্তার।

কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘বুড়িচং উপজেলায় রপ্তানিযোগ্য ভ্যালেন্সিয়া এবং বাড়ি ৯০ জাতের আলোর ভালো ফলন হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় কৃষকরা কার্ডিনাল, ডায়মন্ড ও সানশাইন যাতে দেশীয় আলু চাষ করে লক্ষমাত্রা অর্জন করেছে। কিন্তু দাম এবারও কম। সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মণ ধরে আলু বিক্রি হচ্ছে। এই দামে বিক্রি হলে লোকসানই হবে।’

কুমিল্লার কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আলু একসময় ওএমএসে বিক্রি হয়েছে। আলুর দাম পেতে হলে আলু দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানিযোগ্য আলু চাষে আগ্রহী হতে হবে কৃষকদের এবং সরকার উদ্যোগ নিলে আলু রপ্তানিও সম্ভব।’

কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘আলু চাষে কুমিল্লা কৃষকরা আগ্রহী। উৎপাদনও ভালো। কিন্তু মৌসুমে আলু বিক্রি নিয়ে কৃষকরা যে সমস্যায় পরে তা নিয়ে তাদের দাবি সরকারকে জানাতে পারব।’

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, ‘কৃষিমন্ত্রী মহোদয় কুমিল্লার সন্তান। তিনি কুমিল্লার পাশাপাশি সারাদেশের কৃষকদের কথাই ভাববেন। সরকারিভাবে আলু সংগ্রহ করে কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করা যায় কি না- আমরা বিষয়টি কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে জানাব।